Jharapata 87 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 87

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 87

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৮৭


🌹💞🌹💞🌹💞🌹

ঘন ঘন বাজ পড়ছে। মিলি শক্ত মুঠোয় ধরে আছে রনির কাঁধের কাছে। বাইক চালাতে অসুবিধা হচ্ছে, কিন্তু এখন মিলিকে সেটা বলা বৃথা, অভিজ্ঞতা থেকে রনি ভালোই জানে। ও চেষ্টা করছে জ্যামজটের মাঝখান দিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারে বাড়ি ফিরতে। 

বাড়ি গিয়ে যা বকুনি দেওয়ার দেবে মিলিকে। যদি ও না আসত, কী করত আজ? হুঁশ আছে মহারাণীর? 

মিলির মনে হচ্ছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে রনিকে। আর কেউ যেন ওর কাছাকাছি আসতে না পারে, কেউ যেন ওর সঙ্গে কথা বলতে না পারে। রনি কাছে থাকলে, আর কেউ ওকে বিরক্ত করতে পারবে না জানে। 

কোথা থেকে যে রনি হঠাৎ এসে হাজির হল, ও জানে না। জানতে চায়‌ও না। শুধু জানে, এখন ও না এলে মিলি বোধহয় পলাশের কথা কাউকে না জানিয়ে এত সহজে ওখান থেকে চলে আসতে পারত না। 

একবার বাজের আওয়াজে শক্ত করে ধরেছিল ওকে। সেভাবেই ধরে আছে। ঐটুকুই ওকে সাহস দিয়েছে। মিলি বুঝতে পারছে, বারবার বিদ্যুতের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক, বাজের আওয়াজে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই ওকে ছুঁতে পারছে না। মনে হচ্ছে দুহাতে রনিকে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে মুখ গুঁজে রাখে। 

ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। রনি জোরে চেঁচিয়ে বলল, "ধরে বোসো, চেষ্টা করি বাড়ি চলে যাওয়ার।"

বৃষ্টি আর হাওয়ার আওয়াজে কিচ্ছু শুনতে পায়নি মিলি। রনির গায়ে তাও একটা উইন্ডচিটার ছিল, মিলি শিফনের শাড়ি পরে বসে আছে। ব্যাগে একটা ভারী স্টোল। ফেরার সময় গায়ে দিত। এখন প্রথম বৃষ্টির জলেই ভিজে কেঁপে উঠল। 

মিনিট দুয়েক পর রাস্তার ধারে জমা আরও কয়েকটা বাইকের পাশে বাইক থামিয়ে রনি বলল, "হবে না। এত ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে। নামো চটপট, ঐ দোকানটার শেডের নিচে চলে যাও, আমি আসছি।"

মিলি নেমে বুকের কাছে দুহাত জড়ো করে কাঁপছে। রনিকে ছাড়া ও এখন কোথাও যাবে না। রনি লাফিয়ে নেমে বাইক লক করতে করতে আবার মিলিকে বলল, "দোকানের শেডের নিচে চলে যাও।" 

পিছন ফিরে দেখল মিলি যায়নি। ভিজে কাঁপছে, শাড়িটা ভিজে গিয়ে গায়ের সঙ্গে সেঁটে আছে। ঝমঝমে বৃষ্টি হলেও ফুল মাস্ক হেলমেটের জন্য মাথা ভেজেনি। কিন্তু ভিজে শাড়ি পরা মিলিকে দেখে নিজের শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। হাঁ করে তাকিয়ে আছে, পা গুলো যেন রাস্তায় গেঁথে গেছে। ওর পাশ দিয়ে জল ছিটিয়ে শাঁ শাঁ করে গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে, খেয়াল নেই। আর মিলি তো ওকে ছাড়া কিছুই দেখতেও পাচ্ছে না। 

হঠাৎ আবার বিদ্যুৎ চমকায়, বাজের আওয়াজে রনির ঘোর কেটে যায়। মিলি ঠান্ডায় কাঁপছে, তার সঙ্গে ওর জামাকাপড়ের যা অবস্থা, রাস্তায় লোকজনের মাঝখানে এভাবে থাকা যাবে না, সেটা হুঁশ আসে রনির। 

তাড়াতাড়ি উইন্ডচিটারটা খুলে ওর গায়ের উপর ছুঁড়ে দেয়, "এটা পরো, কুইক। পরে এদিকে এসো।"

মিলি উইন্ডচিটারটা ফেরত দেয়, "লাগবে না, আমার একটা স্টোল আছে।"

রনি মাথা নাড়ে, "এটাই পরো, তোমার শাড়িটা ভিজে গেছে..... মানে খুব খারাপ দেখাচ্ছে। লোকজন আছে এখানে।"

ভীষণ লজ্জা পেয়ে মিলি ঝটপট উইন্ডচিটারটা পরে, রনি হেল্প করে। ততক্ষণে রনি পুরোপুরি ভিজে গেছে। মিলির হাত ধরে দৌড়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় ও। আরও জনাদশেক পুরুষ মহিলা, ভেজা, আধভেজা সবাই। 

রনি হেলমেট খুলে রুমাল বের করে মাথা মুখ মোছে। ব্যাকপ্যাকটা পিঠ থেকে খুলে সামনে এনে ঝাড়ে। মিলিকে বলে, "তোমার ফোন কোথায়? ভেজেনি তো?"

তখনই খেয়াল করে মিলি ওর কনুইয়ের কাছটা ধরে রেখেছিল এতক্ষণ। রাস্তার লোকজনের মাঝখানে ওকে জড়িয়ে ধরা, হাত ধরে রাখা, খুব অস্বাভাবিক মিলির পক্ষে। তখন বাজ পড়ায় ভয় পেয়েছিল ভাবলেও, এখন জায়গা খুব কম বলে ওর প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মিলি। তাও ওকে ছাড়ছে না? রনি বোঝে, কিছু গোলমাল আছে। 

ব্যাগ খুলে ফোনটা দেখে মিলি বলে, "ঠিক আছে, ভেজেনি।"

- "ব্যাগে ভরে রাখো।" নিজের ফোন থেকে পিউকে ফোন করে বলে, মিলি ওর সঙ্গে আছে, বৃষ্টিতে আটকে আছে ওরা। 

ফোন কেটে আরেকটু কাছে টেনে নেয় মিলিকে, "শীত করছে? কিছু খাবে?" মিলি মাথা নাড়ে, খাবে না। ওর এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে, মিলি যে কাঁপছে সেটা বুঝতে পারছে। নিজের‌ও শীত করছে ভিজে গায়ে। একবার মিলির দিকে তাকিয়ে দেখল, ফ্যাকাশে হয়ে আছে ফর্সা রঙটা, চুল থেকে ছোট্ট ছোট্ট ফোঁটায় জল ঝরছে, নাকের ডগাটা লাল হয়ে আছে, ভিজে ঠোঁট কাঁপছে। নিজের বুকের ভিতরে একটা হাতুড়ি পড়ছে বুঝতে পারছে রনি, মিলির কাঁধের উপর হাতের মুঠোটা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। 

তাতেই হয়ত মিলি মুখ তুলে তাকাল। কাজলটানা চোখদুটো লাল। রনি জানে না, বাইকে বসে কাঁদছিল মিলি। কিন্তু ওকে কিছু বলা দরকার, এটা বুঝতে পারে। 

- "আরেকটু দেখি, বাজ পড়াটা বন্ধ হলে বেরিয়ে যাব। কেমন? কিছু খাও না।" মিলির মুখ থেকে নিজের চোখ সরাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে স্টেশনারি দোকানটার দিকে ভালো করে দেখে রনি। তারপর ওয়ালেট বের করতে করতে বলে, "দাদা একটা চকলেট দিন না।"

মিলি আবার ওর কনুই ধরে টানে, "তুমি খাবে না?"

- "তোমার থেকে খাব, ঐ বড় বক্সটা দিন দাদা।" চকলেট বক্সটা মিলিকে দিয়ে ও হাসে, "আমার আসলে খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে।"

দোকানের ভদ্রলোক বলেন, "চা খাবেন? আমার কাছে ফ্লাস্কে চা আছে।"

বিক্রির জন্য চা আছে শুনে বৃষ্টিভেজা সবাই চা খায়, এটা ওটা প্যাকেটের খাবার কিনে খায়। বৃষ্টি কখন কমবে, কে কোনদিকে যাবে কথাবার্তা হয়। আচমকা বৃষ্টিতে বন্দী হয়ে পড়া সবাই একটু ফ্রি হয়। 

মিলি একই রকম নিষ্প্রভ, রনি খেয়াল করেছে। ওর তাড়ায় দু একটা চকলেট খেয়েছে। ওকেও দিয়েছে। এখন বক্সটা হাতে ধরে রেখেছে। কেউ কেউ দোকান থেকে সিগারেট কিনে ধরিয়েছে। তীব্র শীতে নিঃশ্বাসের সঙ্গে তামাকের পোড়া গন্ধটা পেতেই রনির পুরনো নেশাটা আবার মাথাচাড়া দেয়। লোভীর মতো সবার হাতের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

শেষে মিলিকে বলে, "এ বৃষ্টি ধরবে না সহজে। চলো বেরিয়ে পড়ি। যত সময় যাবে, ঠান্ডা লাগবে।"

মিলি ইতিমধ্যেই নাক টানছে, গলায় খুশখুশ। তাছাড়া মন‌ও ভালো লাগছে না। বাড়ি গেলেই ভালো। হেলমেটটা পরতে পরতে রনির পিছনে বেরিয়ে আসে। 

বাড়িতে সবাই আঁতকে ওঠে দুজনকে চুপ্পুড় ভেজা দেখে। ব্যাগ ট্যাগ চেয়ারে ছুঁড়ে দিয়ে রনি বলে, "মিলি শিগগির জামাকাপড় ছাড়ো, শুকনো জামা পরো। আমিও আসছি। বৌদি চা দাও।"

মিলি ছুটে মণিকার ঘরে ঢোকে, ওর সব জিনিস ঐ ঘরে। রনি দোতলায় পা বাড়াতেই বনি আটকায়, "তুই আমার ঘরে চল, আমার জামা প্যান্ট পরে নিবি। তোর ঘরটা একটু বন্ধ আছে।"

- "মানে? আমার ঘরে কী হয়েছে?" রনি ভুরু কুঁচকে তাকায়। 

চলবে