#মানুষ_হবার_যাত্রাপথে_আমার_ধর্ম
সে বহু দূরের কথা - প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে। পৃথিবী তখন আজকের মতো শান্ত নীল গ্রহ ছিল না; ছিল আগ্নেয়গিরির উন্মত্ততা, বিষাক্ত আকাশ, অক্সিজেনের প্রায় অনুপস্থিতি। তবুও সেই আদিম সাগরের অন্ধকার জলে একদিন নীরবে জন্ম নিয়েছিলাম আমি - এককোষী, নামহীন, অথচ সম্ভাবনায় ভরা সূক্ষ্ম একটি প্রাণ।
তখন আমার কোনো পরিচয় ছিল না, ছিল না কোনো জটিল শরীর। নিউক্লিয়াসহীন সেই সরল অস্তিত্বে ছিল শুধু এক অদম্য তাগিদ - টিকে থাকা। সূর্যের আলোকে আত্মস্থ করে আমি জীবন রচনা করতে শিখলাম। তখনই প্রথম আমার ধর্ম জন্ম নিল - #বেঁচে_থাকা_এবং_বেড়ে_ওঠা।
কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ঢেউ আমাকে বহন করে নিয়ে গেল নতুন রূপে। প্রায় ৫-৭ কোটি বছর আগে আমি হয়ে উঠলাম ক্ষুদ্র এক প্রাইমেট - গাছের ডালে ডালে যার ঘর। মাটির চেয়ে আকাশ তখন ছিল বেশি নিরাপদ। ডাল আঁকড়ে ধরতে ধরতেই আমি অজান্তে ভবিষ্যতের হাত তৈরি করছিলাম; যে হাত একদিন কলম ধরবে, সৃষ্টি সুখের উল্লসিত সঙ্গীত লিখবে।
আরও পথ পেরিয়ে আমি হলাম আর্বোরিয়েল প্রাণ। তখন আমি দোল খেতে শিখলাম, দূরত্ব মাপতে শিখলাম, ভারসাম্য রাখতে শিখলাম। শরীর বদলাচ্ছিল, কিন্তু বদলাচ্ছিল না আমার ধর্ম। বেঁচে থাকার সেই অন্তর্লিখিত মন্ত্র আমাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল সমুখপানে।
তারপর এল অর্ডিপিথেকাসের দিন। তখন আমি গাছেও উঠি, মাটিতেও নামি - দুই জগতের মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত সেতু। চারপাশে হিংস্রতা, প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো; তবুও আমি থামিনি। কারণ আমার ভেতরে তখনও জ্বলছিল সেই প্রাচীন অগ্নি - বেঁচে থাকো, এগিয়ে চলো।
প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে আমি অস্ট্রালোপিথেকাস হয়ে প্রথমবার দু’পায়ে দাঁড়ালাম। সেই দাঁড়ানোই ছিল এক নীরব বিপ্লব; পশু থেকে মানুষ হবার প্রথম উচ্চারণ। দিগন্ত তখন আর শুধু দেখা নয়, ডাকার মতো হয়ে উঠল।
হোমো হেবিলিস হয়ে আমি পাথর তুলে নিলাম হাতে - প্রকৃতিকে শুধু ভয় নয়, ব্যবহার করতে শিখলাম।
হোমো ইরেক্টাস হয়ে আগুনকে বশ মানালাম আমি। অন্ধকারের বিরুদ্ধে প্রথম ঘোষণা করলাম আলোর যুদ্ধ। আফ্রিকার মাটি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকলাম আমি এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে।
শেষপর্যন্ত আমি হয়ে উঠলাম হোমো স্যাপিয়েন্স - যে ভাবতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে। আমার কণ্ঠে জন্ম নিল ভাষা, আমার অনুভবে গড়ে উঠল সংস্কৃতি, আমার মিলনে তৈরি হলো সমাজ। আমি পশুকে বশ মানালাম, মাটিকে চাষ করলাম, পৃথিবীর অন্তর থেকে তুলে আনলাম অজস্র সম্পদ।
কলকারখানার শব্দ, বিদ্যুতের ঝলক, ইন্টারনেটের অদৃশ্য জাল, এমনকি আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা - এই সমস্ত বিস্ময়ের মূলে আছে আমার সেই একটিই ধর্ম, যা আদিম সাগর থেকে আমার সঙ্গে পথ চলেছে - বেঁচে থাকা, এবং ক্রমাগত বেড়ে ওঠা। এই বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার প্রবৃত্তিই আমাকে টিকিয়ে রাখছে এবং এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আজ আমি আকাশ ছুঁতে চাই, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যাত্রার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যত দূরেই যাই, আমার ভেতরে এখনও জেগে আছে সেই প্রথম প্রাণের স্পন্দন - আমার ধর্ম - বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা। এই ধর্মই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। এই ধর্মই আমাকে ভবিষ্যতেও এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই মানব বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ধর্ম না থাকলে আমি আমার অস্তিত্বকেই টিকিয়ে রাখতে পারতাম না। আমি আমার স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হইনি বলেই "আমি" হয়ে উঠতে পেরেছি।
আমার ধর্ম কোনো মতবাদ নয়, আমার ধর্ম কোনো পরিচয় বাচক শব্দ নয়, আমার ধর্ম কোনো গ্রন্থ নয় - আমার ধর্ম হলো বিবর্তন। আরও অধিক বিবর্তন। আমার ধর্ম হলো অগ্রসর হওয়া। আরও বেশি অগ্রসর হওয়া। আমার ধর্ম হলো জীবন নিজেই। কারণ আমি শুধু আজকের মানুষ নই; আমি সেই আদিম সাগরের স্মৃতি, আগুনের প্রথম আলো, আর অনন্ত ভবিষ্যতের পথিক।