ঝরাপাতা
পর্ব - ৬২
🥀🌿🥀🌿🥀🌿🥀
- "আর কোনো কথা না, তুমি যাও রনিদা। তোমার জন্যই বাবার শরীর খারাপ হচ্ছে। তোমাকে আর কোনো ক্ষতি করতে দেব না আমি। ভাইয়া, তুই তাড়াতাড়ি ডাঃ মিত্রকে ফোন কর। চেম্বারে থাকলে সোজা ওখানেই চলে যাব।" মিলি রনির দিক থেকে পুরোপুরি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল।
- "মিলি, আমরা চলে যেতাম। কিন্তু দাদার শরীরটা........। বনি থাক তোদের সঙ্গে। মাথা ঠান্ডা কর মা।" মিলির মাথায় হাত রাখে মণিকা।
- "কাকিমা, প্লিজ, ভালো লাগছে না। তোমরা এখন যাও। দরকার পড়লে আমরা ডাকব।" মিলি এক ঝটকায় সরে গেছিল।
- "মা, এক্ষুণি চল এখান থেকে। যে অপমান তুমি করেছ, আমি অন্ততঃ মনে রাখব মিলি। তোমাদের কারো কোনো ডাকে আমরা এ বাড়িতে পা দেব না।'' রনি দপদপিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।
পিছনে মিলি তখন বলছে, " ওদের বলে দাও তো, মরে গেলেও আমি ওদের বাড়ির কাউকে ডাকব না।"
রনি সবটাই শুনেছিল। নিজেদের গেটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল ও। বাকিরা ধীর পায়ে রাস্তা পেরোতে যেন একযুগ লাগিয়ে দিচ্ছিল। দাদার পকেটে চাবি, দরজা খুলতে পারছে না ও।
ওরা গেট পেরিয়ে ঢুকতেই রনি জোরেই দাদাকে বলে উঠেছিল, "তোদের কি পা জমে গেছে নাকি? অপেক্ষা করছিস, ঐ মেয়ের অহঙ্কার ভাঙবে আর পায়ে ধরে ডাকবে?"
কথাটা শেষ করতে পারেনি, মায়ের হাতের চড় আছড়ে পড়েছিল ওর গালে। জীবনে প্রথমবার কেউ গায়ে হাত তুলল, তাও এই বয়সে। রনি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল।
দাদা সামনে এসে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "তোকে মেরে মুখ ভেঙে দিতে পারলে শান্তি হত আমার। কি করে পারলি লিলির জন্য এই অসভ্যতাটা করতে? ছিঃ ছিঃ।"
- "দাদা, তোরা........" রনির গলা দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না। ততক্ষণে বনি এগিয়ে গিয়ে বাড়ির দরজা খুলেছে। সবার পিছনে রনিও বসার ঘরে ঢোকে। গালটা জ্বালা করছে, চোখও। সবচেয়ে জ্বলছে বুকের ভিতরে। প্রথমে মিলি, তারপর মা, সবাই, সবাই ভুল ভাবল? সবার এই ধারণা ওকে নিয়ে?
হ্যাঁ, লিলির জন্য বলেছে ও। সে কি লিলিকে ভালোবাসে বলে? সমস্ত ঝামেলা মিটে গেলে ভালো লাগত বলে চেয়েছিল লিলির সঙ্গে ওদের মিটমাট হয়ে যাক। যুগল যেমন ওর আর মিলির সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছিল।
এরা নাহয় কিছু জানে না, মিলি সব জেনেও? আগেও একবার লিলিকে নিয়ে ভুল বুঝে অশান্তি করল। আর এবার? এবার কি হবে?
- "বনি, আমি তোকে বলে দিচ্ছি, এই ছেলে যেন আমার চোখের সামনে না আসে। হাড় মাস কালি করে দিল। এতগুলো মাস গোটা পাড়ার লোকের অপমান সহ্য করলাম। এবার ভাবলাম মেয়েটাকে বাড়িতে আনব, সব সুরাহা হবে। সেটা হবে না তো, আমার কপালে কি সুখ আছে !" মা মাথা চাপড়াচ্ছিল সোফায় বসে।
রনি চোরের মতো দাঁড়িয়ে। বনি গজগজ করছিল, "আশ্চর্য ছেলে বটে। একবার তেড়ে গিয়ে ঝগড়া করে নাক কাটিয়ে এলো। সেগুলো মেটালাম, আবার মাথার পোকাগুলো নড়ে উঠল।"
রনি অবাক হতেও ভুলে গেছিল, অম্লানবদনে দাদা বলে যাচ্ছে, সেই অশান্তি নাকি ওরা মিটিয়েছে ! মিলির কাছে হাঁটু গেড়ে বসে মাপ চেয়ে ও মিটিয়েছে ! হ্যাঁ, যুগল আর লিলি বলতে পারে, ওরা মিটিয়েছে। সেদিন নিজেদের বাড়িটাই দিয়ে গেছিল ওরা মিলির সঙ্গে একান্তে কথা বলার জন্য। সেই জন্যই ওদের ভালো করতে চেয়েছিল।
- "মামনি, তুমি শান্ত হও। কাকুর শরীরটাও হঠাৎ এসব চাপে খারাপ লাগছে বলে। একটু ঠিক হোক, কাল আমরা গিয়ে কথা বলবখনে।" বৌদি মাকে ঠান্ডা করছিল।
- "কোন মুখ নিয়ে যাব ওদের বাড়িতে? কি বলব গিয়ে? আমার এই ছেলে.......বনি, ওকে যেতে বললি এখান থেকে? আমার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেন ও?"
- "মা, আমাকে ভুল বুঝছ......"
- "বনি, ও এখানে থাকলে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব। কোনো মন্দিরে গিয়ে থাকব, রেলস্টেশনে বসে থাকব বলে দিচ্ছি তোকে।" মা চীৎকার করে উঠেছিল।
- "এ্যাই তুমি যাও না। যা করার করেছ, এবার মাকে আর অশান্তি দিও না, এখান থেকে যাও।" বৌদি বলতে বলতেই রনি ওদের সামনে থেকে সরে আসে।
পরদিন বৌদি গেছিল, কাকুর খবর নিতে। রনি ওদের আলোচনায় শুনেছে, উনি এখন ভালো আছেন। তবে মিলি বলে দিয়েছে, ও আর এ বাড়িতে আসবে না। রনি যখন নিজের ইচ্ছেমতোই চলে, নিজের মতোই থাক।
রনি বুঝেছে, উদ্দেশ্য ভালো হলেও, হঠাৎ মাথায় আসা একটা কথা বলে ফেলে, আর সেই কথা মানাতে জিদ ধরে, খুব বড় ভুল করে ফেলেছে ও।
লিলি আর যুগল জানত মিলিকে এ বাড়িতে আনা হবে। রনির কাছে সেসব খবর নিতেই ফোন করেছিল ওরা। মজার মুডে কথা শুরু করে এই খবর শুনে ওরাও খুব বকাবকি করেছে। তাও তো রনি রেখেঢেকে বলেছে।
দুজনেই ওকে বলেছে, ওদেরও ইচ্ছে করে এ বাড়িতে আসতে। তবে এই সময়ে না বলে, পরে ধীরেসুস্থে একবার বলে দেখলে হত। বাবা মার মনমেজাজ ঠিক নেই এতমাস ধরে। এখন অন্ততঃ মিলিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারলে, কিছুটা মানসিক শান্তি পেলে, তখন হয়ত রনির কথা শুনত। মিলিও এভাবে রিএ্যাক্ট করত না।
রনিও বুঝেছে, সবচেয়ে বড় ভুল ওটাই হয়েছে। জায়গা আর সময়টা মোটেই উপযুক্ত ছিল না এই কথার জন্য। মিলিকে বাড়িতে আনার অনুষ্ঠান হয়ে যেত। তখন মিলিকেই সঙ্গে করে বাড়িতে দাদাবৌদিকে আগে বুঝিয়ে সবাই মিলে কথাটা তুললে, সম্পূর্ণ অন্যরকম হত।
- "কিন্তু এখন আমি কি করব? একটা লোক আমার সঙ্গে কথা বলছে না, আমার স্বভাব চরিত্র নিয়ে যা তা ভাবছে। আমার কথাগুলো বোঝাবো কি করে এদের? কোনোদিন আর নিজের লোকেদের কাছেই যেতে পারব না? আর মিলি? ও চিরকাল আমাকে ভুল বুঝবে?"
রনির ভাবনার মধ্যেই দরজায় ধাক্কা, সঙ্গে বৌদির চীৎকার, "ভাই, শিগগির এসো, মায়ের খুব শরীর খারাপ।"
চলবে