ভুল পথে পেলাম তোমাকে –
“এক রাত অন্ধকারে — আলো টিকে থাকলে বাঁচবে”
অন্ধকার মানেই শূন্যতা নয়।
কখনো কখনো অন্ধকার মানে—
সবচেয়ে সত্য মুখগুলো।
ইরা চোখ খুলতেই বুঝল—
সে আর সেই ঘরে নেই।
কোনো দেয়াল নেই।
কোনো ছাদ নেই।
চারপাশে শুধু ঘন কালো—
যেন রাত নিজেই একটা জীবন্ত শরীর।
সে একা।
— “মায়া…?”
ডাকটা শব্দ হয়ে ফেরত এলো না।
ইরার বুকের ভেতর একটা মুহূর্তের জন্য কাঁপন উঠল।
কিন্তু সে নিজেকে থামাল।
— “না,”
সে নিজেকে বলল।
“এটাই পরীক্ষা।”
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে
হালকা হাসির শব্দ।
— “ভয় পাচ্ছ?”
আরভের কণ্ঠ।
ইরা ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
— “না।
আমি প্রস্তুত।”
আরভ ধীরে ধীরে সামনে এলো।
তার শরীর যেন ছায়া দিয়ে গড়া।
— “তাহলে শুরু করি,”
সে বলল।
“এক রাত।
তোর সব আলো আমি কেড়ে নেব।
দেখি তুই কী থাকিস।”
◆ ১. প্রথম ঘণ্টা — একাকীত্ব
হঠাৎ আরভ মিলিয়ে গেল।
অন্ধকার আরও ঘন।
ইরার মনে পড়ল—
শৈশবের সেই ঘর।
বন্ধ দরজা।
চিৎকার।
হঠাৎ সে আবার ছোট হয়ে গেল।
একটা মেয়ের কণ্ঠ—
— “তুমি সবসময় সমস্যা।”
— “তোমার জন্যই সব নষ্ট।”
ইরা কান চেপে ধরল।
— “এগুলো সত্য না।”
কিন্তু কণ্ঠ থামল না।
— “কেউ কখনো তোকে বেছে নেয়নি।”
— “মায়াও না।”
এই কথাটা
বুকে ছুরি হয়ে বিঁধল।
ইরা হাঁপাতে লাগল।
— “মিথ্যে…
মায়া আমাকে ভালোবাসে…”
অন্ধকারে আয়নার মতো কিছু ভেসে উঠল।
মায়া।
কিন্তু তার চোখ ঠান্ডা।
— “আমি তোকে বাঁচাতে পারব না,”
ছায়া-মায়া বলল।
“তুই খুব দুর্বল।”
ইরার হাঁটু ভেঙে গেল।
কিন্তু সে কাঁদল না।
— “ভালোবাসা দুর্বলতা না,”
সে ফিসফিস করল।
“ভালোবাসা বেছে নেওয়া।”
আয়না ভেঙে চুরমার।
প্রথম ঘণ্টা পার।
◆ ২. দ্বিতীয় ঘণ্টা — লোভ
আলো ঝলসে উঠল।
হঠাৎ ইরা নিজেকে পেল
একটা সুন্দর ঘরে।
নরম বিছানা।
খোলা জানালা।
শান্তি।
একজন মহিলা এগিয়ে এলো।
— “তুই ক্লান্ত,”
সে বলল।
“এখানে থাক।
কিছু দায়িত্ব নেই।
কিছু লড়াই নেই।”
ইরার চোখ ভারী হয়ে এল।
— “এটাই কি…
স্বাভাবিক জীবন?”
মহিলা হাসল।
— “হ্যাঁ।
ভালোবাসা ছাড়া,
ব্যথা ছাড়া।”
ইরা বিছানায় বসে পড়ল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—
মায়ার চোখ,
যখন সে হাসে না,
কিন্তু পাশে থাকে।
ইরা উঠে দাঁড়াল।
— “এই শান্তি ফাঁকা।”
মহিলার মুখ বদলে গেল।
— “তুই কষ্ট পছন্দ করিস?”
— “না,”
ইরা শান্তভাবে বলল।
“কিন্তু আমি সত্য পছন্দ করি।”
ঘর ভেঙে পড়ল।
দ্বিতীয় ঘণ্টা শেষ।
◆ ৩. তৃতীয় ঘণ্টা — লজ্জা
এবার চারপাশে মানুষ।
চেনা মুখ।
অচেনা চোখ।
তারা ফিসফিস করছে।
— “ওই মেয়েটা অন্য মেয়েকে ভালোবাসে।”
— “অস্বাভাবিক।”
— “লজ্জা নেই?”
ইরার গলা শুকিয়ে গেল।
তার শরীর ভারী।
একজন এগিয়ে এলো।
— “এত সহজ জীবন ছেড়ে
এই পথ কেন?”
ইরা চুপ।
আরেকজন—
— “তুই যদি বদলে যেতিস—
সব ঠিক হতো।”
ইরার চোখে জল জমল।
কিন্তু সে মাথা তুলে বলল—
— “আমি বদলাইনি।
আমি নিজেকে খুঁজেছি।”
মানুষগুলো গলে গেল।
তৃতীয় ঘণ্টা পার।
◆ ৪. চতুর্থ ঘণ্টা — মায়ার পরীক্ষা
হঠাৎ—
মায়া সামনে।
বাস্তব।
রক্তাক্ত।
— “ইরা…”
মায়া কাঁপা কণ্ঠে বলল।
“আমাকে বাঁচা।”
ইরা দৌড়ে গেল।
— “আমি আছি!”
মায়া পিছিয়ে গেল।
— “না।
তুই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিস।”
ইরার বুক ফেটে যাচ্ছিল।
— “এটা সত্য না!”
আরভের কণ্ঠ—
— “তোর আলো ওকে আগুনে ফেলেছে।”
মায়া চিৎকার করল।
— “যদি আমাকে ভালোবাসিস—
আমাকে ভুলে যা!”
ইরা থেমে গেল।
এইটাই সবচেয়ে কঠিন।
সে চোখ বন্ধ করল।
— “ভালোবাসা মানে অধিকার না,”
সে বলল।
“ভালোবাসা মানে—
মুক্তি।”
মায়ার রূপ বদলে গেল।
আসল মায়া না।
ছায়া ভেঙে পড়ল।
চতুর্থ ঘণ্টা শেষ।
◆ ৫. মধ্যরাত — আরভের সত্য
আরভ আবার সামনে এলো।
সে এবার ক্লান্ত।
— “তুই কেন ভাঙছিস না?”
সে ফিসফিস করল।
ইরা শান্ত।
— “কারণ আমি একা না।”
— “কিন্তু মায়া এখানে নেই।”
ইরা হাসল।
— “ভালোবাসা জায়গা চায় না।”
আরভ চুপ।
প্রথমবার তার চোখে
হতাশা।
— “আমি একা ছিলাম,”
সে ধীরে বলল।
“কেউ আসেনি।”
ইরা বলল—
— “কেউ আসেনি,
মানে কেউ আসতে চায়নি—
তা না।”
আরভ মুখ ঘুরিয়ে নিল।
মধ্যরাত পেরোল।
◆ ৬. শেষ ঘণ্টা — নিজের মুখোমুখি
শেষে আর কোনো ছায়া নেই।
শুধু ইরা।
আরেকটা ইরা।
অন্ধকার ইরা।
— “তুই ভয় পাস,”
অন্য ইরা বলল।
— “হ্যাঁ।”
— “তুই দুর্বল।”
— “হ্যাঁ।”
— “তুই কাঁদিস।”
— “হ্যাঁ।”
অন্য ইরা হাসল।
— “তাহলে তুই শক্ত কীভাবে?”
ইরা সামনে এগিয়ে গেল।
নিজেকে জড়িয়ে ধরল।
— “কারণ আমি পালাই না।”
আলো ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকার ভাঙল।
◆ ৭. ভোর
ইরা চোখ খুলল।
সে আবার সেই ঘরে।
মায়া সামনে দাঁড়িয়ে।
চোখ লাল।
হাত কাঁপছে।
— “ইরা…?”
ইরা ধীরে হাসল।
— “আমি ফিরে এসেছি।”
মায়া তাকে জড়িয়ে ধরল।
এবার কোনো শক্তি নেই—
শুধু ভালোবাসা।
আরভ দূরে দাঁড়িয়ে।
সে মাথা নিচু করল।
— “চুক্তি শেষ,”
সে বলল।
“আমি সরে যাচ্ছি।”
সে মিলিয়ে গেল।
ঘর শান্ত।