#ঝরাপাতা
পর্ব - ১২
🌿🍃🌿🍃🌿🍃🌿
এবারও সকলে আবার আলোচনায় বসল। শেষে সিদ্ধান্তও একই হল, একবার দেখানো হোক মিলিকে। ডঃ গিরিকে ডঃ মাইতিও কিছুটা জানালেন, বাড়ির লোকদেরও আবার নতুন করে বহুরকম প্রশ্নও করলেন ডঃ গিরি।
পিউসহ সকলের কথা শুনলেন, প্রশ্ন করলেন, তার এ্যাসিস্টেন্টরা সবটা রেকর্ড করলেন। গোপা আর সমরের মাঝখানে বসিয়ে রেখে মিলির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন।
কথাবার্তা হচ্ছিল ওর চেম্বারে চা বিস্কুট নিয়ে বসে, বেশ খোলামেলা ঘরোয়া ধাঁচে। সবাই বোঝে, এটাই মনোবিদ হিসেবে ওর এ্যাপ্রোচ। এদের সহজ হতে দিচ্ছেন।
শেষে বললেন, সঙ্গীতের বিভিন্ন বিভাগ কিভাবে মানসিক সমস্যার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সমস্যা থেকে মানুষের মনকে মুক্ত করতে পারে, তা নিয়ে কাজ করছেন উনি। তার পেপার দেশে বিদেশে গ্রাহ্য হয়েছে। এই পদ্ধতিতে মানসিক সমস্যা, বিশেষ করে ডিপ্রেশনের চিকিৎসার লাইসেন্সও রয়েছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তিনি এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করছে যারা, তেমন একটি ক্লিনিকের সঙ্গে যুক্ত। এভাবে মিউজিক থেরাপিস্টরা নিজেদের কাজগুলো একজায়গায় করে তার থেকে ডাটা সংগ্রহ আর সংরক্ষণ করছেন। খুব একেলে চিকিৎসা পদ্ধতি এটা নয়। উনিশশো চল্লিশ সাল থেকে ধীরে ধীরে মনোবিজ্ঞান এদিকটা তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি এবং দ্রুত ফলদায়ক পদ্ধতি হলেও, যে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জনসচেতনতা অত্যন্ত খারাপ স্থানে আছে আন্তর্জাতিক বিচারে, সে দেশে এখনও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এই পদ্ধতি।
এইসব বললেন, যাতে ওরা সবাই চিকিৎসার পদ্ধতি নিয়ে একটা প্রাথমিক ধারণা করতে পারে। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করাবে কিনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সবদিক খতিয়ে ভেবে দেখতে পারে। তার সঙ্গে এও বললেন, চিকিৎসায় মিলির সেরে ওঠা আর আগের স্বাভাবিক মেয়েটার ধরণ ফিরে পাওয়ার মধ্যে কিন্তু তফাৎ আছে। মিলিকে ক্লিনিক্যালি সুস্থ ঘোষণা করা হবে যখন, তখন ওর ব্যক্তিত্ব বদলে যাওয়াও সম্ভব।
সবাই বাড়ি ফিরে আলোচনা করে। পিউকেও ওরা এই আলোচনায় ডাকেনি। নিজের ভাইবোনের পরিবারের সঙ্গেই কেবল আলোচনা করল সমর আর গোপা। সকলেই একমত, বছর পঁয়তাল্লিশের, মধুর ব্যক্তিত্বের এই মনোবিদের সঙ্গে কথা বলে ওদের অনেকটাই উদ্বেগ কমেছে। চিকিৎসার ভার এর হাতেই দেওয়া হোক। পিউকে দিয়েই জানিয়ে দেওয়া হয় ও বাড়িতে। মিলির থেরাপি শুরু হয়।
আজ পাঁচ নম্বর সেশন, এখন কিছুটা রেসপন্স করছে মিলি, খাওয়া ঘুম নিয়মিত হয়েছে। চেম্বারে মিউজিক থেরাপি, বাড়িতে যখন যেভাবে যে মিউজিক শোনানোর জন্য কিছু স্যাম্পেল দেওয়া হয়েছে পেন ড্রাইভে, সেগুলোর ব্যবহার আর সঙ্গে ওষুধের প্রভাবে। তবে পিউও এখনও মিলির সামনে আসেনি।
ডঃ গিরি নিজেই আজ কথা বলতে চেয়েছেন সকলের সঙ্গে। এখন অবশ্য নিজের চেম্বারে সমর, গোপা আর মিলির সঙ্গে কথা বলছেন। বাইরে ওরা চারজনই কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে। কেস হিস্ট্রি পেয়ে যাওয়ার পর ওদের কেন ডাকলেন? মিলির চিকিৎসায় কি নতুন কোনো জটিলতা ! রনি টেনশনে নখ খাচ্ছিল। মিলির সঙ্গে ওদের বাড়িতে কি কি হয়েছে, সবটাই পিউ প্রথম দিনই গুছিয়ে বলেছে, ও জানে। বাকি কিছুই তো মিলি সম্পর্কে ও জানে না। রিসেপশনের সন্ধ্যার পর আর দেখেনি পর্যন্ত। ওরা আলাদা ভাবে এসেছে এখানে। আলাদা একটা ওয়েটিং রুমে বসেছে। ওকে কি প্রশ্ন করার থাকতে পারে, যার উত্তর মিলির চিকিৎসায় লাগবে? নাকি শুধুই মিলির স্বামী হিসেবে ওকে ডাকা হয়েছে?
নিজের মনেই ভাবছিল, "তার জন্য ডেকেও কোনো লাভ হবে না। আমি বোধহয় জগতের সবচেয়ে অপদার্থ স্বামী, যে বিয়ের পর থেকে নিজের স্ত্রীর প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করা দূরে থাক, তাকে চোখেও দেখিনি।"
ডাক পড়তে চেম্বারের ভিতরে ঢুকে একটু হকচকিয়ে গেল পিউ বাদে তিনজন। খুব হালকা আলো, বিরাট বড় একটা টেবিলের উলটোদিকে ডঃ গিরিকে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে। সালোয়ার কামিজ পরা, তবে এত কম আলোয় তার রঙ বা ভদ্রমহিলার কমপ্লেক্সন ইত্যাদির আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। সামনের চেয়ারগুলোতে গোপাদের পাশে বসতে বসতে ওরা বুঝতে পারে, চেম্বারের একটা দেওয়াল সম্পূর্ণ কাঁচের। তার ওপারের ঘরের জোরালো আলোতেই আসলে এই ঘরটা আলোকিত।
- "বসুন আপনারা। আমি মহানন্দা গিরি।" মিষ্টি, সুরেলা, বন্ধুত্বপূর্ণ গলা ভদ্রমহিলার। গলা শুনেও তাই বয়েস বোঝা যায় না। ওরা তিনজন একে একে পরিচয় দেয়।
- "ভালো লাগলো আপনারা এসেছেন বলে। দেখুন ঐ ঘরে অদ্রিজা মানে মিলির আজকের সেশন শুরু হচ্ছে। আজ প্রথম ওকে একলা ওখানে নেওয়া হল। এতদিন ওর মা সঙ্গে থাকতেন। গুড সাইন হল, ও আজ এসে আমাকে, আমার দুই এ্যাসিস্টেন্টকে গুড আফটারনুন উইশ করেছে। এই আধঘণ্টা আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। এমনকি গান শোনার জন্য ও ঘরে যেতেও এককথায় রাজি হয়েছে।"
রনির মনে হল, ওর ঘাড় মাথা থেকে একটা দশমণি বোঝা নামল। মিলি সুস্থ হয়ে যাবে। অন্ততঃ এই সময়টার পর মেয়েটা ভাল থাকবে। ওদিকে মিলি এ ঘরের দিকে পিছন ফিরে একটা নিচু সোফায় বসেছে। ওর মুখ বা শরীর স্বাস্থ্য বিশেষ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মিলি বা অন্য যে কেউ হতে পারে। আর মিলি তো পিছনে এই ঘরটাই টের পাচ্ছে না, ভিতরে কোনো আলো না থাকায়।
এখন জোরালো সাদা আলোর বদলে খুব মায়াবী একটা নীল আলো মিলির ঘর জুড়ে। তিনদিকের দেওয়ালে সমুদ্রের তলার ছবি, প্রবাল প্রাচীরের নানা রঙের ছটা, রঙিন মাছের ঝাঁক দেওয়ালের গাঢ় হালকা নানা শেডের নীল রঙের জলের স্রোতের খাঁজে খাঁজে। আলোছায়ার খেলায় এতটা দূর থেকে বোঝা না গেলেও, আন্দাজ করা যায় বেশ ভাল দরের শিল্পী হাতে এঁকেছেন এই ছবি। দেওয়ালেই কি সরাসরি আঁকা? কারণ একটানা একটাই ছবি। এদেরও মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের তলায় বসে চারপাশের দৃশ্য দেখছে।
- "আমার এ্যাসিস্টেন্টরা ওকে এ্যাটেন্ড করছেন। ওর নার্ভ আর ব্রেনকে সাপোর্ট দেবে এরকম কিছু মিউজিক এখন বাজবে ওখানে, ওকে সঙ্গে কিছু হালকা মজার বই পড়তে দেওয়া হবে। ওরা মাঝে মাঝে গল্পও করবে ওর সঙ্গে রিএ্যাকশন রেকর্ড করার জন্য। আমরাও ওকে দেখতে পাব এখান থেকে। এখন বলি, যেজন্য আজ আপনাদের দুই ফ্যামিলির সবাইকে আমি চেয়েছি।"
এরা গুছিয়ে বসে ডাক্তারের দিকে মনোযোগ দেয়। মিলির থেরাপির সিস্টেম দেখে মণিকা আর বনির মন অনেকটা হালকা হয়েছে। পিউ প্রথম থেকেই দেখেছে বলেই অনেক রিল্যাক্স আজকাল। ওদেরও বলেছিল সব কথা। তবে রনির মাথায় একটা অন্য চিন্তাও উদয় হয়েছে। সে প্রসঙ্গে পরে সমর আর গোপার সঙ্গে কথা বলবে ভেবে রনিও ডাক্তারকেই আপাততঃ এ্যাটেনশন দেয়।
চলবে